স্কুলের নামে ভুয়া পেজ খুলে ছাত্রীর ভিডিও প্রকাশের পর মরদেহ উদ্ধার

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের একটি স্কুলের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় চরম উৎকণ্ঠা আর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের নামে ভুয়া একটি ফেসবুক পেজ খুলে ওই ছাত্রীর একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, আর এর পর থেকেই সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। অপমান ও লজ্জা সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরেই গলায় ফাঁস নিয়ে জীবনের ইতি টানে এই শিক্ষার্থী।  


পরিবার জানায়, কয়েক দিন ধরেই মেয়ে অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিল, কারও সঙ্গে তেমন কথা বলত না, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারেননি তারা। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের কটূক্তি আর মন্তব্য তাকে আরও একঘরে করে দেয়। পরিবার যখন সবকিছু সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখনই এক রাতে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও তার আর প্রাণে বাঁচানো যায়নি।  


এ ঘটনায় সহপাঠী, বন্ধু ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার, ভুয়া পেজ আর চরিত্রহননের এই প্রবণতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জরুরি। শিক্ষার্থীরা বলছে, কারও ব্যক্তিগত বিষয়কে নিয়ে এভাবে বিদ্বেষ ছড়ানো কখনোই ‘মজা’ নয়, বরং তা সরাসরি একেকটি জীবন ধ্বংস করে দেয়।  


স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের জন্য অনলাইন হয়রানি এখন বড় এক মানসিক চাপের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন শিক্ষার্থী যখন পরিবার, সমাজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না, তখন সে নিজেকে একা ও অসহায় ভাবতে শুরু করে। এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, সময়মতো পাশে দাঁড়াতে না পারলে একটি অপমানজনক পোস্ট, একটি ভিডিও কিংবা একটি স্ট্যাটাসও কারও জীবনের শেষ প্রাবন্ধ হয়ে যেতে পারে।  


‘আমার ছাত্র কণ্ঠে’ বলতে চাই—  

আমরা যারা স্কুলে পড়ি, আমাদের অনেকেই এখন ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটকসহ নানা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ছবি, ভিডিও—সবই হয় অনলাইনে। কিন্তু কেউ যখন এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে অপমান, লজ্জা আর ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র বানিয়ে ফেলে, তখন সেটা আর বিনোদন থাকে না, হয়ে যায় হিংস্র মানসিক নির্যাতন। আজ যে সহপাঠীর ভিডিও, তার জায়গায় কাল যে আমি বা তুমি হব না—এর নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।  


তাই আমাদের প্রজন্মের প্রতিটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব,  

- কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া শেয়ার না করা  

- ভুয়া আইডি বা পেজ থেকে কাউকে হেয় করে এমন কিছু না দেখা, না শেয়ার করা, বরং রিপোর্ট করা  

- বন্ধু বা সহপাঠীকে অনলাইনে হয়রানির শিকার হতে দেখলে চুপ না থেকে শিক্ষক, পরিবার বা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করা  


একজন সহপাঠীকে আমরা হারিয়েছি, যার ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। তবে তার চলে যাওয়া আমাদের চোখ খুলে দিতে পারে—অনলাইন বুলিং, ভুয়া পেজ, কটূক্তি আর character shaming যেন আর কোনো শিক্ষার্থীর জীবন কেড়ে নিতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই। আমাদের স্কুল, পরিবার আর সমাজ—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে এসে এমন অপরাধকে ‘মজা’ নয়, অপরাধ হিসেবেই দেখতে শিখতে হবে।
 

নবীনতর পূর্বতন