দ্বিগুণ গতিতে জাল সনদধারী ধরার পরিকল্পনা ডিআইএর

 

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগে অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি আর **জাল** সনদের মাধ্যমে চাকরি নেওয়া এক ধরনের ‘খোলা গোপন’ হিসেবে থেকে গেছে। এই অনিয়ম থামাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) এখন তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে আরও দ্রুত ও বড় পরিসরে অভিযান চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

ডিআইএর মূল কাজ হলো এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং শিক্ষকদের সনদের বৈধতা যাচাই করা। কিন্তু সারাদেশে যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার এমপিও প্রতিষ্ঠান, সেখানে মাত্র ১৩০ জনের জনবল নিয়ে পুরো নেটওয়ার্ক নজরদারির চেষ্টা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ কারণেই সংস্থাটি জনবল দ্বিগুণ করে অন্তত ২৩০ জনে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে মাসে যতগুলো প্রতিষ্ঠানে অডিট করা হয়, সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়। 


ইতিমধ্যে ডিআইএর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, গত কয়েক বছরে কয়েক শ শিক্ষক ভুয়া বা জাল সনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্তই ১,১৮৬ জন জাল সনদধারীকে শনাক্ত করার তথ্য রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই রাজশাহী বিভাগে, আর বাকিরা খুলনা, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এদের অনেকেই এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধনের নকল কাগজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অনুমোদন হারানো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন রয়েল ও দারুল ইহসানের সনদ ব্যবহার করেছেন। কেউ কেউ আবার কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য সনদ জাল করে তার ভিত্তিতে সুবিধা নিয়েছেন। 

শুধু সনদ জালিয়াতি নয়, ডিআইএর অডিটে বেরিয়ে এসেছে বেহাত হওয়া জমি ও অর্থ আত্মসাতের চিত্রও। কিছু প্রতিষ্ঠানের জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে, আবার কোথাও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নামে আসা সরকারি টাকা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব তদন্তের ভিত্তিতে ডিআইএ শত শত একর জমি উদ্ধার এবং শত শত কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করেছে, যার কিছু বাস্তবায়নের পর্যায়ে আছে। 

ডিআইএ এখন যে পরিকল্পনা নিচ্ছে, তার মূল লক্ষ্য দুই দিক থেকে চাপ তৈরি করা। একদিকে জাল সনদধারীদের দ্রুত শনাক্ত করে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত আদায়ের সুপারিশ করা, অন্যদিকে ভবিষ্যতে কেউ যেন এই পথে হাঁটতে না পারে—সেই ভয় ও নিরুৎসাহ সৃষ্টি করা। এজন্য সংস্থাটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে, পরিদর্শনের নামে কারও সঙ্গে লেনদেন বা ঘুষ নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; কেউ এমন প্রস্তাব দিলে সরাসরি ডিআইএকে ফোন বা ইমেইলে জানাতে বলা হয়েছে এবং অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। 


ডিআইএর পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম সরাসরি আহ্বান জানাচ্ছেন, যারা জাল সনদ দিয়ে চাকরি পেয়েছেন, তারা যেন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে ইতিমধ্যে নেওয়া সব বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে জমা দেন। অন্যথায় ভবিষ্যতে যখন অভিযানে ধরা পড়বেন, তখন শুধু চাকরি হারানোর ঝুঁকি নয়, মামলা, বেতন ফেরত, এমনকি অন্য আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। 


সব মিলিয়ে, এই উদ্যোগ সফল হলে একদিকে জাল সনদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ‘নকল শিক্ষক সমাজ’ দ্রুত পরিষ্কার হবে, অন্যদিকে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার প্রতি আস্থা কিছুটা হলেও ফিরে আসবে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার এবং সরকারি শিক্ষাখাতে ব্যয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর। 

নবীনতর পূর্বতন