সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘৯ম পে-স্কেল’ বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী বাজেটে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বাজেট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সব ঠিক থাকলে আগামী ১ জুলাই থেকেই এই নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে কার্যকর করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধের চড়া চাপের মধ্যেও সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সামগ্রিক আকারও তুলনামূলক অনেক বড় হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলটি হুট করে একবারে নয়, বরং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে:
প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): মূল বেতনের (বেসিক) একটি বড় অংশ বৃদ্ধি করা হবে, যা গ্রেডভেদে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২০২৮ অর্থবছর): এই ধাপে অবশিষ্ট মূল বেতন সমন্বয় করা হবে।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): চূড়ান্ত ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ভাতাসহ অন্যান্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নতুন কাঠামোর আওতায় এনে পে-স্কেলের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হবে।
নতুন পে-স্কেলের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই গ্রেডভিত্তিক বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনা। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনার জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী—
২০তম গ্রেডের (সর্বনিম্ন) মূল বেতন বর্তমানের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
১ম গ্রেডের (সর্বোচ্চ) মূল বেতন বর্তমানের ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
এর ফলে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতনের পরিমাণ শতকরা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জন্য নতুন করে ‘যাতায়াত ভাতা’ চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নতুন এই পে-স্কেলের আওতায় শুধু বর্তমান কর্মরতরাই নন, দেশের প্রায় ৯ লাখ সাধারণ পেনশনভোগীকেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর ফলে স্বল্প পেনশনপ্রাপ্ত প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।
এদিকে, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা যে ১০ শতাংশ হারে ‘মহার্ঘ ভাতা’ পাচ্ছেন, তা নতুন এই বেতন কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে এবং কতটুকু সমন্বয় করা হবে, তা নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। খুব শিগগিরই এই কমিটির দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

